মারনের বিরুদ্ধে লড়াই অপারেশন সূর্যোদয়

সংস্কৃতে ভিহান কথার অর্থ সূর্যের প্রথম আলো। ভিহানের কাজটাও তাই।এইচআইভি আক্রান্তদের জীবনে নতুন আলোর সঞ্চার করা। যাঁরা কোনওরকম চিকিৎসা না করিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁদের বুঝিয়ে পুনরায় চিকিৎসায় ফেরানোর দায়িত্ব ভিহানের।

0

দীনেশ জোশী। জীবনের লড়াইয়ে আরেক অক্লান্ত বিপ্লবী।


ঘটনাটা ২০০৩ সালের। আজ থেকে ১২ বছর আগের। ‘এইডস’ নামটা তখন ছিল আরও ভয়াবহ। দীনেশ যখন জানতে পারলেন তিনি এইচআইভি আক্রান্ত, তখন তাঁর কাছে পড়েছিল ঠিক দুটি রাস্তা-এক, সবকিছু ছেড়ে চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে বন্দি করে ফেলা। দুই, সমস্ত পৃথিবীর সামনে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো। নিজের অসুখটাকে স্বীকার করে নিয়ে সঠিক চিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া। দীনেশ দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিলেন। কিন্তু পথটা এত সহজ কখনোই ছিল না।


দীনেশ জানালেন, যখনই কেউ তাঁর অসুখের ব্যপারে জানতে পারতেন, তখনই হয় করুণার চোখে দেখতেন, নয়তো সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতেন। সাধারণের এই ব্যবহার দীনেশকে মানসিক ভাবে আরও ভেঙে দিচ্ছিল। একমাত্র এসএন মেডিকেল কলেজের ডাক্তার অরভিন্দ মাথুর দীনেশকে মনের শক্তি যুগিয়ে যাচ্ছিলেন। আর সেই শক্তির নাম যোধপুর নেটওয়ার্ক অফ পজিটিভ পিপল (যেএনপি+)। যেএনপি+ তৈরির প্রথম দিকে দীনেশ সমাজের কাছ থেকে খুব একটা সমর্থন পাননি। সরকারের সাহায্যের খুব একটা স্থিরতা ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা গেল, সংক্রামক ব্যক্তিরা চারদেওয়াল ছেড়ে সংগঠনে একত্রিত হচ্ছেন। একে অপরের মনোবল বাড়াচ্ছেন। দীনেশের মত, যখন নিজের সঙ্গে নিজের সংঘর্ষ বন্ধ হয় যায়, তখন এই সমাজে বেঁচে থাকার রাস্তাটাও সহজ হয়ে যায়।


এইডস আক্রান্তদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, সামাজিক অচ্ছুত হওয়ার ভয়। এটা ভেবেই তাঁরা মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। প্রোজেক্ট ভিহান ঠিক এই ধরনের মানুষদেরই মানসিক স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সংস্কৃতে ভিহান কথার অর্থ সূর্যের প্রথম আলো। ভিহানের কাজটাও তাই। আক্রান্তদের জীবনে নতুন আলোর সঞ্চার করা। এই প্রোজেক্টে সরকারের বিভিন্ন নীতি সম্পর্কে অবগত করানো হয়, কী কী চিকিৎসা রয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়। যাঁরা কোনওরকম চিকিৎসা না করিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁদের বুঝিয়ে পুনরায় চিকিৎসায় ফেরানোর দায়িত্ব ভিহানের। এইচআইভি আক্রান্ত মায়েদের পাশে দাঁড়ানো, এমন কী বিধবাদের পেনশেনর ব্যবস্থাও করে ভিহান।

এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের জন্য বাল বসেরা


যোধপুর এবং তার আশেপাশের এলাকার মধ্যে সামাজিক সাম্য প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে এইডস আক্রান্তদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আর এই মারণরোগ আক্রান্ত বাচ্চারা? ‘যেএনপি+’-এর কর্মী ভাবনা পারেখ জানিয়েছেন, বাচ্চারা একেবারেই নিষ্পাপ হয়। তারা বুঝতেই পারে না আশপাশের তাদের সঙ্গে কেন এমন ব্যবহার করছে। ভাবনা ১০ বছর আগে নিজের এইচআইভি স্বামী এবং সন্তানকে একসঙ্গে হারিয়েছেন। সেই শোকে তাঁর বাবামারও মৃত্যু হয়। আজ তিনি বাল বাসেরায় একজন কর্মী হিসেবে এই শিশুগুলোর মধ্যে থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন। বাল বাসেরায় বর্তমানে ৬০টি বাচ্চা রয়েছে। এরা কেউ এই রোগের জন্য নিজে দায়ী নয়। এখানে প্রত্যেকটা বাচ্চাকে লেখাপড়া শেখানো, খেলানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়। যাতে তারা পরবর্তীকালে স্বাবলম্বী হতে পারে। এইচআইভি আক্রান্ত বলে নিজেদের প্রতি যেন লজ্জা না অনুভব করে। যেএনপি+’র এই উদ্যোগে বর্তমানে অনেকেই সেখানে আসেন সরকারের নীতি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সুবিধা জানতে। এর মধ্যে যেমন এইচআইভি আক্রান্তরা রয়েছেন, তেমনি যাঁদের এই রোগ নেই তাঁরাও রয়েছেন!


ভবিষ্যতে সরকারের সহায়তায় এইচআইভি বাচ্চাদের জন্য আলাদা একটি আশ্রয় করতে চান দীনেশ। ২০১৩-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী এইচআইভি-তে ভারত তৃতীয় স্থানে। ২০১৪-র পরিসংখ্যানে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ তাঁদের অসুখ সম্পর্কে জ্ঞাত। এদের বেশিরভাগই অনুন্নত এলাকার বাসিন্দা। আসা করা যায়, ‘যেএনপি+’-র উদ্যোগে অদূর ভবিষ্যতে এই পরিসংখ্যানও বদলাবে।