গ্রামবাংলায় কর্ম-সংস্থানের লক্ষ্যে দ্য ম্যাজিক অফ গিভিং

0

ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামাজিক পরিসর, সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ব্যক্তিগত রাগ, ক্ষোভ, যন্ত্রণা যেমন প্রতিফলিত হয় ফেসবুকের পাতায় তেমনই সমমনস্ক মানুষরা মেতে ওঠেন আলাপচারিতায়, তৈরি হয় ফেসবুক গ্রুপ, কমিউনিটি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভার্চুয়াল পৃথিবীতেই শেষ হয়ে যায় সেইসব আলোচনা, যোগাযোগ ঘটে না বাস্তবের সঙ্গে।

বছরদু'য়েক আগে ফেসবুকে এরকমই একটি গ্রুপ তৈরি করেন অমিতাভ গুপ্ত। আরও অনেক ফেসবুক গ্রুপের মতোই বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অশিক্ষা ইত্যাদি নানা সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হত সেই গ্রুপে। কীভাবে এইসব সমস্যার সমাধান হতে পারে আলোচনা হত তাই নিয়েও। সেইসব আলোচনার মধ্যেই অমিতাভ বুঝতে পারেন শুধু ফেসবুকের দেওয়ালে আলোচনা করে বদলাবে না কিছুই, বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনতে হবে এইসব পরিকল্পনা।

“সত্যি কথা বলতে কি ব্যক্তিগত জীবনের একটা খারাপ সময় দিয়ে যাচ্ছিলাম, নিজেকে কোনো একটা কিছুতে ব্যস্ত রাখা দরকার ছিল, এমন কিছু একটা করতে চাইছিলাম যাতে মানসিক তৃপ্তি পাই, সেখান থেকেই ভাবনাটা আসে”, বললেন অমিতাভ। 

সেই ভাবনা অনুযায়ীই অমিতাভ তৈরি করেন দ্য ম্যাজিক অফ গিভিং। অমিতাভ বললেন, “অন্যকে বাড়তে সাহায্য করার মধ্যে একটা আনন্দ আছে, সামাজিক বৃদ্ধির জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ”।

বেকারত্ব একটা বড় সমস্যা আমাদের দেশে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দিন দিন কমছে। চাকরির জন্য ঘুরতে হয় নানা বহুজাতিক সংস্থা ও কর্পোরেটের দরজায়। অনেক সময়ই যোগ্যতা থাকলেও সফট্ স্কিলের অভাবে চাকরির দৌড়ে পিছিয়ে পড়েন মফস্বল বা গ্রামের সাধারণ ঘরের ছেলে মেয়েরা, পাল্লা দিতে পারেন না ঝাঁ চকচকে কর্পোরেট দুনিয়ায়। আর এই যুবক যুবতীদেরই সাহায্য করে দ্য ম্যাজিক অফ গিভিং।

অমিতাভ হিউম্যান রিসোর্স নিয়ে এমবিএ করেছেন, চাকরি করেছেন ভারতীয় রেলওয়েতে, এরপর নভার্টিস ফার্মাসিউটিক্যালে চাকরির সময় ইএসএতে কাটিয়েছেন বেশ কিছুটা সময়। তারপর দেশে ফিরে স্বামী বিবেকানন্দ গ্রুপ অফ ইনস্টিটিউশনে এইচ আর হিসেবে যোগ দেন অমিতাভ. সেখানেই এই প্রয়োজনীয়তাটা বেশি করে উপলব্ধি করেন তিনি।

“অনেকেই যারা চাকরির আবেদন করেন, শিক্ষাগত দিক দিয়ে যথেষ্ট যোগ্য হলেও অন্যান্য দক্ষতা না থাকায় আমরা তাঁদের নিতে পারি না, অনেক ক্ষেত্রেই ইন্টারভিউ দিতে এসে আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটে, নার্ভাস হয়ে পড়েন, এই জায়গাগুলিই কাটাতে চাই আমরা”, বললেন অমিতাভ।

দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নানা কর্মশালার আয়োজন করে দ্য ম্যাজিক অফ গিভিং। প্রত্যাশা তৈরি, অ্যাপটিটিউড টেস্টের জন্য প্রস্তুতি, মক গ্রুপ ডিসকাশন ও পিআই, পরিবেশনার দক্ষতা বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট কোম্পানিভিত্তিক প্রস্তুতির নির্দেশিকা ইত্যাদি নানা বিষয় থাকে এই কর্মশালায়। এক কথায় একজন প্রার্থীকে চাকরির জন্য সম্পূর্ণভাবে তৈরি করিয়ে দেওয়াই কাজ এই কর্মশালার। এছাড়াও ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট, ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস, মার্কেটিংয়ের প্রাথমিক শিক্ষা, এইচআর ইত্যাদি বিষয়ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

শুধু প্রশিক্ষণই নয় জব ফেয়ারেরও আয়োজন করে দ্য ম্যাজিক অফ গিভিং। এখনও অবধি ৭৮৫ জন প্রার্থী চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মাধ্যমে। সোনারপুর, ব্যারাকপুর, বর্ধমান, দুর্গাপুর, মালদা ইত্যাদি ছোট শহর ও শহরের উপকন্ঠ এলাকায় এই কর্মশালা ও জব ফেয়ারের আয়োজন করা হয়।

সংস্থাটি গড়ে তুলতে স্বামী বিবেকানন্দ গ্রুপ অফ ইন্সটিউটের ডিরেক্টর ড.নন্দন গুপ্তর থেকে সাহায্য পেয়েছেন অমিতাভ। দ্যা ম্যাজিক অফ গিভিং ৬ লক্ষ টাকা বিনিয়োগও পেয়েছে এই সংস্থা থেকে, পরিবর্তে তাদের কাজের মাধ্যমে স্বামী বিবেকানন্দ গ্রুপ অফ ইন্সটিউট ব্র্যান্ডের প্রচার করেছে তারা। এছাড়াও টিসিএস ও স্বামী বিবেকানন্দ গ্রুপ অফ ইন্সটিটিউটের পাঁচটি সিএসআর ইভেন্টও আয়োজন করেছে এই সংস্থা।

ইন্টার্নদের নিয়োগ করেই কাজ করায় দ্য ম্যাজিক অফ গিভিং। এখনো অবধি প্রশিক্ষণ বা জব ফেয়ারের জন্য কর্পোরেট সংস্থাগুলির থেকে কোনো টাকা নেওয়া হত না, তবে সামনে মাস থেকে কর্পোরেট সংস্থাদের থেকে পরিষেবা ভিত্তিক টাকা নেওয়া হবে, যদিও চাকরি প্রার্থীদের থেকে কখনোই টাকা নেওয়া হবে না বলে জানালেন অভিষেক।

গ্রাম ও মফস্বলের ছেলে মেয়েদের চাকরির বাজারের জন্য উপযুক্ত করে তোলা, ও বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থায় তাদের চাকরির ব্যবস্থা করাই লক্ষ্য এই সংস্থার। কলকাতা থেকে দূরে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে জব ফেয়ার, ক্যাম্পাসিং ইত্যাদি করার জন্য কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে রাজি করানোই সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অভিষেক। তথ্য প্রযুক্তি, রিটেল, টেলিকম, ব্যাঙ্কিং, ইন্সিওরেন্স, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে, তাদের প্রয়োজনীয়তাগুলি বুঝে, গ্রামীণ এলাকার যুবক যুবতীদের প্রশিক্ষিত করা ও চাকরির ব্যবস্থা করা ভবিষ্যত পরিকল্পনা অভিষেকের।

“এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন, তাই আপাতত ফান্ড সংগ্রহের দিকে জোর দিচ্ছি আমরা, যাতে আমরা বাংলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে পৌঁছতে পারি ও বেকার সমস্যা সমাধানে কিছু কাজ করতে পারি”, জানালেন অভিষেক।