খাঁটি বাঙালি খানা চেখে দেখতে চলুন লোকআহারে

1

মোচার চপ, কবিরাজি পাতুরি অথবা বাটি পোস্ত। কটা রেস্তোরাঁ এই কলকাতার বুকে আছে যে খাঁটি বাঙালি পদ রেঁধে খাওয়াবে? সে হিসেব দেওয়া মুশকিল। তবে যোধপুর পার্কের লোকাহারে পৌঁছে যেতে পারলে নিখাদ বাঙালি খানার ইচ্ছে পূরণ হবেই।

বাসুদেব ঘটক, রাঁধতে ভালোবাসেন, আর ভালোবাসেন খেতে এবং খাওয়াতে। বাঙালি শিল্প ও সংস্কৃতি, হস্তশিল্পের পৃষ্ঠপোষক তিনি। বড় বড় রেস্তোরাঁ থেকে অলিতে গলিতে হয় চাইনিজ নয় মোগলাই খানার মেনুতে ঠাসা। বাসুদেব যখন রেস্তোরাঁ খুলবেন ভাবলেন, ঠিকই করে নিলেন ‘নো বিদেশি খানা, আমার রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাবে খালি বাঙালি খাবার, সেই অবিভক্ত বাংলা থেকে যা চলে আসছে, আমাদের দিদা-ঠাকুমা অথবা তারও আগে যতরকম বাঙালি খানা যেগুলি হয়ত বাঙালির হেঁসেল থেকেই হারিয়ে গিয়েছে, সে সবকিছু পাওয়া যাবে এই লোকাহারে’, চ্যালেঞ্জ ঠুকে বসলেন উদ্যোক্তা বাসুদেব ঘটক।

৪০ আসনের এই রেস্তোরাঁ আদতে একটি অ্যাপার্টমেন্টের নীচতলার ঘরকে সাজিয়ে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোনও গিমিক,মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি কিছু নেই। খাবারের অর্ডার নেওয়া, সার্ভ করা সব নিজের হাতেই করেন ঘটক। বলতে গেলে ঘরোয়া পরিবেশে নিজের হাতে রেঁধে বাঙালি পদ খাওয়ান বাসুদেব। দেওয়ালে পটচিত্র, ফুল আঁকা দেওয়াল,দরজা যে কারও নজর টানবে। গ্রাম থেকে পটচিত্র শিল্পী একজোড়া দম্পতিকে আনিয়ে দেওয়াল আঁকান তিনি। পুরনো দিনে গ্রামে বাঙালি বিয়ের নানা আচার, শিকার পর্ব, মিছিল, উদযাপন, পালকি চড়া, পাত পেড়ে খাওয়া, বনভোজন। তাছাড়া বিয়েতে বাড়ির উঠোনে লম্বা পাত পড়ত, তাতে পাত পেড়ে খাওয়া-এমন বাঙালি অনুষ্ঠানের নানা ছবি দেওয়াল জুড়ে। গোটা দেওয়ালে মাটির রঙ। ভারী কাঠের ডাইনিং টেবল-চেয়ারেও শিল্পের ছোঁয়া। বর্ধমানের কাঠের শিল্পীকে দিয়ে তৈরি সবকিছু। গেটের বাইরে তুলসিতলা রেস্তোরাঁয় বাঙালিয়ানার নতুন মাত্রা যোগ করেছে লোকাহারে।

খাবার জায়গাটা দুভাগে ভাগ করা। একটা অংশে দূরের গ্রাম থেকে সংগ্রহ করে আনা নানা হস্তশিল্প আর খাবারের সম্ভার। মূলত গ্রামের শিল্পীদের প্রচারের আলোয় আনাই লক্ষ্য। ব্যবসার এই অংশ থেকে খুব একটা লাভ আসে না, বললেন বাসুদেব। ‘আমি চাই গ্রামে গ্রামে গিয়ে সেখানকার স্থানীয় গান, বাউল গান রেকর্ড করে আনতে। সেই সব গান বাজবে আমার রেস্তোরাঁয়। বাঙালি খানার সঙ্গে মাটির গান, দ্বিতীয় কোথাও পাবেন না’, তৃপ্তির হাসি বাসুদেবের মুখে।

আর লোকাহারের মেনু একবার শুনে রাখুন। আম পোড়ার সরবত, গরম সাদা ভাত, শুক্তো, নারকোলের ডাল, আলুভাজা, এঁচোড়ের ডালনা, ধোকার ডালনা, বড়ি দিয়ে পাবদা মাছের ঝোল, মাংস ভাজা, ইলিশ মাছের পাতুরি, চিংড়ি কবিরাজি, খাসির মাংসের বনবাংলো, পোলাও, লালশাক, কুমড়ো ফুলের বড়া, নারকোল কড়াশুঁটির মুগডাল, আলুর দম, পটল ভাজা, ভেটকি ভাপা, চিকেন অথবা মাটন কষা, আমের চাটনি, গন্ধরাজ লেবুর ঘোল, দই, মিষ্টি, কালো চালের পায়েস, পাপড়, দরবেশ, মিহিদানা এভাবে অন্তত একশ রকমের পদ থাকে প্রতিদিনের মেনুতে। তাছাড়া পুজো, পয়লা বৈশাখ সহ নানা উৎসবের দিন স্পেশাল মেনুও রাখা হয়।

তবে কী খেতে চান এক ঘণ্টা বা একদিন আগে ফোন করে জানিয়ে টেবিল বুক করে দিলে সেই অনুযায়ী রান্না করা যাবে। যে যে পদ চাইছেন তার সবটাই। সবজি,মাছ, মাংস প্রতিদিন সকালে বাজার থেকে বুকিংয়ের ভিত্তিতে আনা হয়। আগে থেকে জানিয়ে না গেলে আপনার প্রিয় পদ নাও পেতে পারেন, সতর্ক করলেন বাসুদেব, লোকাহারের উদ্যোক্তা। অতএব বন্ধু হোক বা আত্মীয় স্বজন, প্রথমবার বাংলায় এলে খাঁটি বাঙালি খাবার চেখে দেখাতে নিয়ে যান লোকাহারে, আপনার মান যাওয়ার ভয় নেই, কব্জি ডুবিয়ে খান, কথা দিচ্ছেন লোকাহার কর্তা।