সস্তায় চিনা স্বাদ ‘মোমো টোমো’য়

0


‘মোমো টোমো’। নাম শুনে আর যাই মনে হোক, লড়াই টড়াইয়ের ভাবনা আসবেই না। কিন্তু, বাপ্পাদিত্য বলেন, ‘মোমো টোমো’ একটা লড়াইয়ের নাম। রাগ, দুখ, অভিমান সেখান থেকে লড়াইয়ের শুরু। এবং তারপর একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া। বিন্দু বিন্দু থেকে সিন্ধু। ‘মোমো টোমো’ এখন বাপ্যাদিত্যের কাছে সিন্ধুই বটে। একটা অভিযান জয়ের চাপা উত্তেজনা। নিজে উত্তরের বাসিন্দা হলেও একেবারে দক্ষিণে এসে খুলে ফেলেছিলেন ছোট্ট একটা ফুডস্টপ, এন্টেয়ার কনসোডিয়াম অব এশিয়ান ফ্লেভার-‘মোমো টোমো’র এটাই কনসেপ্ট। বাপ্পাদিত্য ভট্টাচার্য, একরকম বীতশ্রদ্ধ হয়ে সাংবাদিকতা ছেড়ে শুরু করছিলেন নতুন লড়াই। কষ্মীনকালেও যার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না, নেমে পড়লেন সেই ব্যবসায়। মাত্র তিন বছরে জাঁকিয়ে বসেছেন ভোজন রসিকদের মনে। ঘরে ঘরে। ভোজন রসিক মধ্যবিত্তদের নাগালে ভালো স্বাদের অথেনটিক চাইনিজ ফুড তুলে দিয়ে রীতিমতো হিট ‘মোমো টোমো’।

সেই কবে, বলা যায় একরকম ছোটবেলাতেই মিডিয়ায় কাজ শুরু করেন। শনিবারের বারবেলা, জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠানে শোনা যেত বাপ্পাদিত্যর গলা। তারপর টেলিভিশন প্রোডাকশন। ইটিভি, খাসখবর, স্টারআনন্দ এবং সবশেষে চ্যানেল টেনে নিজের দক্ষতায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। লেখার হাতও বেশ দড়। বাপ্পা নিজেকে বলেন ‘রাগী লেখক’। চ্যানেল টেনে কাজ করতে করতেই বুঝতে পারছিলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে চ্যানেল শেষ হতে বসেছে। শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে অনেকগুলি ছেলেমেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল মালিকপক্ষ। নিজের খারাপ লাগা এবং অনেকটা বিরক্তি থেকে বিকল্প পেশার ভাবনা আসতে থাকে মনে।

চিরকালই খেতে ভালোবাসেন, খাওয়াতে ভালোবাসেন। খেতে গিয়ে দেখেছেন, একগাদা গাঁটের কড়ি খসিয়েও ঠিকঠাক চিনা খাবারের স্বাদ পাওয়া মুশকিল। আর কম দামে যা পাওয়া যায়, তার কথা ছেড়ে দেওয়াই ভালো। ফলে ধরেই নিতে হবে ঠিক স্বাদের, ঠিক মানের চিনা খাবারের জন্য বড় রেস্তোরাঁয় যেতেই হবে। ঠিক এখান থেকেই চ্যালেঞ্জটা নিতে আর দেরি করেননি প্রাক্তন সাংবাদিক। কালিকাপুরের রূপদাসি মার্কেটে খুলে ফেললেন ‘মোমো টোমো’, এশিয়ান ফ্লেভারড কুইসিন। লক্ষ্য ছিল, মধ্যবিত্তকে রেস্তর মধ্যে অথেনটিক চাইনিজ খাবারের স্বাদ এনে দেওয়া। দাম কম রাখতে গিয়ে খাবারের মানের সঙ্গে আপোষ করেননি। বাপ্পাদিত্য জানান, ‘বেছে বেছে নামী শেফ নিয়ে এসেছি রান্নার জন্য। যে খাবার যেভাবে বানানো দরকার সেই ভাবেই রান্না করিয়েছি। তার জন্য খরচ আহামরি কিছু বাড়ে না। বরং দামটা একটু কম রেখে সব শ্রেণির মানুষের কাছে যদি পৌঁছানো যায়, তাতে বিক্রি বেশি। আর সেটাই লাভ’। ‘কাঁড়িকাঁড়ি টাকা খরচ করে বড় রোস্তোরাঁয় খেতে যান অনেকে, কারণ তাঁদের ধারণা, বেশি দামি খাবারের স্বাদও বেশি। অর্থাৎ, দামটাই যেন খাবারের মানের মাপকাঠি। এই ধারণাই ভেঙে দিতে চায় মোমো টোমো’, দাবি বাপ্পাদিত্যর।

‘মোমো টোমো’ ঠিক রেস্তোরাঁ নয়। খাবারের দোকান বলাই ভালো। বসে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। প্রায় সবটাই হোম ডিলিভারি। অর্ডার পেয়ে বাপ্পা নিজেই খাবার পৌঁছে দিয়েছেন বাড়ি বাড়ি। ‘মানুষ যেমন টিভির পর্দায় আমাকে দেখেছেন, তেমনি বাড়ির দরজায় খাবার হাতে হাজির হতেও দেখছেন’, হেসে বলেন আউটলেটের কর্নধার। ‘হোম ডেলিভারি হল এমন একটা কনসেপ্ট, যার মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছানো যায়। বাড়ি বাড়ি খাবার সাপ্লাই করতে গিয়ে অচেনা লোকগুলি হঠাৎ কবে আপন গিয়েছি বুঝতেই পারিনি। এক কর্নেলের বাড়ি খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে, অনেকদিন ওই পরিবারের সঙ্গে ডিনার করে বাড়ি ফিরেছি। আরেক বৃদ্ধ দম্পতির একাকীত্বের কাহিনি শোনা রোজকার রুটিনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এদের সবার সুখ দুখ ভাগ করে নিয়েছি’, মনে করে তৃপ্তি পান এই নয়া উদ্যোক্তা।

যারা চাইনিজ ফুড পছন্দ করেন তাদের কথা ভেবেই ‘মোমো টোমো’। ফ্রায়েড, প্যান ফ্রায়েড, স্টিমড, চকো হরেক রকম মোমোর পাশাপাশি ‘টোমো’তে মিলবে রাইস, নুডলস, ফিস, চিকেন, ভেজের নানা প্রিপারেশন। নিউইয়ারে মোমো টোমোর চমক টার্কির কিছু আইটেম, জানান বাপ্পাদিত্য। খাবার প্রতি অফারও চলতে থাকে বছরভর।

পুরওদমে উদ্যোক্তা বনে গেলেও লেখালেখির অভ্যেস ছাড়েনি বাপ্পাদিত্যকে। নানা পত্রপত্রিকায়, ম্যাগাজিনে লেখা চলছেই। আর ভোলেননি নাটককে। ব্যবসা, হোম ডেলিভারির পাশাপাশি, নিজের গ্রুপ টোটাল থিয়েটারে বাদল সরকারের সারা রাত্তির এবং বাপ্পাদিত্যের নিজের লেখা নাটক কোকিলের বাসার মহড়াও চলে সমান তালে।

গত তিন বছরের লড়াইটা সহজ ছিল না। মাত্র একজন শেফকে নিয়ে ব্যবসা শুরু করছিলেন। সাইকেলে চেপে বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। কখনও শেফের পাশে নিজেও রান্নায় হাত লাগিয়েছেন। বৃথা যায়নি কিছুই। একটা থেকে দুটো। কালিকাপুরের পর এবার দমদমেও আউটলেট হয়েছে ‘মোমো টোমো’র। সংখ্যাটা দ্রুত বাড়াতে চান বাপ্পাদিত্য। সারা কলকাতা জুড়ে ‘মোমো টোমো’ ব্র্যান্ডে আরও অনেক আউটলেট খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন ব্যবস্থাও চালু করে শহরের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যেতে চান তিনি। সমস্যা একটাই। পুঁজির অভাব। অনেকেই আগ্রহ দেখিয়েছেন। হাওড়া এবং শান্তিনিকেতনে ‘মোমো টোমো’র ব্র্যান্ডে আউটলেট খোলার ইচ্ছে দেখিয়েছেন কেউ কেউ। কোনও সংস্থা বা কেউ ব্যক্তিগতভাবে পুঁজি নিয়ে এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গে নিয়ে ‘মোমো টোমো’কে আরো বড় মাত্রা দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন নয়া উদ্যোক্তা বাপ্পাদিত্য ভট্টাচার্য।