প্রাচীর ভাঙতে ‘ডোনেট অ্যা বুক’

একদিন না একদিন, ভেঙে পড়ে ইট-বালি-সিমেন্টের তৈরি শক্তিশালী প্রাচীর। কিন্তু যে প্রাচীর বৈষম্য দিয়ে গড়া, যাকে চোখে দেখা যায় না তা শক্তপোক্ত হয় প্রতিদিন। প্রতিনিয়ত। প্রাচীরের একদিকে বিত্তের ‌ছটা, অন্যদিকে চরম দারিদ্র, হাহাকার। একদিকে ‘জ্যাক অ্যান্ড জিল’ বই নিয়ে শিশু যায় ভোরে স্কুলে, অন্যদিকে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা বিফলে যায় বারবার।

0
সুজান সিং, চেয়ারপার্সন, প্রথম বুকস
সুজান সিং, চেয়ারপার্সন, প্রথম বুকস

কিন্তু যদি ধসিয়ে দেওয়া যায় সেই প্রাচীর? জ্ঞান তো মুক্ত। জলের ওপর মানুষের যেমন অধিকার, সেই অধিকারতো শিক্ষার ওপরেও। সারা দেশ জুড়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য গ্রন্থাগার খুলে ‘প্রথম’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্তা দিল সেই অদৃশ্য প্রাচীরে জোর ধাক্কা।

ফ্ল্যাশব্যাক

কল্পনার টাইম মেশিনে বসে বরং একটু যেন পিছিয়ে যাওয়া যাক। তখন বিংশ শতক শুরু হয়েছে মাত্র। চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রকাশ‌না সংস্থাগুলো হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় বাজারে এনেছে হরেক বই। কিন্তু অন্য ভাষায় বই কোথায়? দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা শিশু, কিশোরদের তো দরকার স্থানীয় ভাষায় সুলভ মূল্যের বই। ‘লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন’ কবিতার চেয়ে ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ পড়ে সে পায় মনের আনন্দ। মনে রাখতে হবে সে প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। তার প্রয়োজন, চাহিদা এক্কেবারে আলাদা। ‘প্রথম বুকস’-এর চেয়ারপার্সন সুজান সিং বলছিলেন, ‘‘মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিশুদের কথা মাথায় রেখে দেশের বেশিরভাগ সংস্থা বই প্রকাশ করে। আমরা করি প্রাচীরের অন্যদিকে থাকা শিশুদের জন্য।’’

প্রাচীর ভাঙার প্রথম ‘চেষ্টা’


‘প্রথম’ এর প্রকাশিত বই
‘প্রথম’ এর প্রকাশিত বই

দরিদ্র শিশু, কিশোরদের কাছে স্থানীয় ভাষায় বই পৌঁছে দেওয়ার জন্য ২০০৪ সাল থেকে দেশ জুড়ে লাইব্রেরি তৈরি করতে লাগল ‘প্রথম’। এরপর এগারোটা বছর। নিরন্তর চেষ্টায় ছ’টি আদিবাসী ভাষা সহ মোট আঠারোটি ভাষায় তারা প্রকাশ করেছে অজস্র বই। সংখ্যাটা খুব কম হলেও এক কোটি চল্লিশ লক্ষ। ‘প্রথম’ হল ভারতের প্রথম মুক্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত (ওপেন লাইসেন্স) সংস্থা। অর্থাৎ যে কোনও প্রকাশনা সংস্থা চাইলে ‘প্রথম’-এর বইয়ের গল্প কিংবা ছবি নিজের বইয়ে ব্যবহার করতে পারে। আগে বই-এর দাম ছিল পঁচিশ টাকা। এখন তা সামান্য বেড়ে পঁয়ত্রিশ টাকা। শুধুমাত্র প্রকাশনার গন্ডিতে আটকে থাকার বদলে কাজের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে চলেছে ‘প্রথম বুকস’। স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গী করে তারা দেশ জুড়ে চালায় একদিন এক একটা গল্প (One Day – One Story) নামের অভিযান। ওয়ার্ল্ড স্টোরি টেলিং ডে-তে হয় গল্প বলার প্রতিযোগিতা। উদীয়মান লেখকদের গল্প পছন্দ হলে যে কোনও প্রকাশনা সংস্থা তা প্রকাশ করতে পারে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে থেকেও ‘প্রথম বুকস’ যেন এক ব্যতিক্রমী নাম। তাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে অসংখ্য সংস্থা।

ডোনেট অ্যা বুক


‘প্রথম বুকুস’-এর কাজকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। শিশুদের জন্য বই প্রকাশ এবং তা প্রকৃত অভাবীদের হাতে তুলে দেওয়া। ‘প্রথম বুকস’-এর গলায় বারবার শোন যায়, ‘‘অ্যা বুক ইন এভরি চাইল্ডস হ্যান্ড’’ স্লোগান। অর্থাৎ, প্রত্যেক শিশুর হাতে একটা করে বই। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? ভারতে শিশুর সংখ্যা তিরিশ কোটি। সেখানে ফি বছর ‘প্রথম বুকস’ থেকে প্রকাশিত হয় মেরেকেটে দশ লক্ষ বই। তফাতটা যে বিস্তর তা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন সুজান। দরকার এক নদী জল, সেখানে কিনা পুকুর। সুজানের কথায় ‘‘ শুধুমাত্র ভাল বই প্রকাশ করলে যে চলবে না, সংখ্যাও যে বাড়াতে হবে তা আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। নতুন কোনও উপায় বার করতে না পারলে থমকে যেতে হবে।’’ মূলতঃ এই ভাবনা থেকে জন্ম নিল ‘ডোনেট অ্যা বুক’ অভিযান।


‘ডোনেট অ্যা বুক’ হল সেতুর মতো। একদিকে স্কুল, কলেজ কিংবা লাইব্ররির মতো প্রতিষ্ঠান, যারা অভাবী শিশুদের হাতে বই তুলে দিতে চায়, অন্যদিকে যারা বইয়ের জন্য অর্থ দিতে রাজি আছেন। ‘প্রথম বুকস’ যেন দু’পক্ষকে মিলিয়ে দিল একই বিন্দুতে। তাদের আশা শিশু-দিবসের আগেই হাতে এসে যাবে পঞ্চাশ হাজার বই কেনার মতো অর্থ।

একা নয় প্রথম

যে পথ দেখিয়েছিল ‘প্রথম’, এখন সে পথে আসছে অনেকেই। ‘প্রথম বুকস’-এর স‌ঙ্গে গাঁটছাড়া বেঁধে লে এবং লাদাখে রিডিং রুম গড়েছে একটি সংস্থা। বিভিন্ন স্কুলে চলছে রিডিং কর্নার। হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, তিব্বতি ভাষায় সেখানে কত বই। দুঃস্থ শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার জন্য জোট বেঁধেছে ‘ইউথ ফর সেবা’ এবং ‘ইন্ডিয়ানস্ মমস কানেক্ট’ নামে দুই আলাদ সংস্থা। বেঙ্গালুরুতে কর্মরত শ্রমিকদের সন্তানরা যাতে সরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়, সেজন্য চলছে ‘ইয়ুথ ফর সেবা’-র প্রশিক্ষণ শিবির।

কে বলতে পারে, আজ যারা স্কুলের আঙিনা থেকে দূরে, একদিন হয়তো তারাই হয়ে উঠবে প্রকৃত জ্ঞানবৃক্ষ। বই দিয়ে তাদের সাহায্য করতে পারেন আপনিও।

Related Stories