সত্যজ্যোতির আলোয় উজ্জ্বল অসমের প্রত্যন্ত গ্রাম

0

অসমের উদলগিরির গভীর জঙ্গল ঘেরা গ্রামে পরিবার নিয়ে থাকেন সত্যজ্যোতি। গ্রামে সাকুল্যে ৪৫টি পরিবার। জঙ্গলের প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই গ্রামে শিক্ষার আলো প্রবেশের সুযোগই পায়নি। সত্যজ্যোতির বাবা-মাও নিরক্ষর। কৃষক। জীবনেও স্কুলের গণ্ডী পেরোননি। অথচ তাঁদের মেধাবী ছেলের ইতিমধ্যেই নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ স্কুলের ইতিহাসে সেই প্রথম পড়ুয়া যে দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে।

গ্রামের ভৌগলিক অবস্থান, আর্থিক অনটনের মোকাবিলা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না সত্যজ্যোতির পক্ষেও। তার বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি। সাইকেলে চেপে স্কুল যাতায়াতে প্রতিদিন অন্তত তিন ঘণ্টা সময় লাগত। উপরন্তু সূর্যাস্তের পর জঙ্গলের বন্য হাতিরা খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। তাই প্রাণনাশেরও আশঙ্কা থাকে।

এই পরিস্থিতিতে প্রাইভেট টিউশনের খরচ চালানোর বাহুল্য মানায় না গ্রামবাসীদের। সত্যজ্যোতির পরিবারও ব্যতিক্রম নয়। বিপুল সম্ভাবনাময় মেধাবী ছাত্রের সাহায্যে তখন এগিয়ে আসে ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্ডিয়া নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সত্যজ্যোতির নবম আর দশম শ্রেণির টিউশনের খরচ বহন করে তারাই।

ক্লাস টেন-এ ওঠার পর রাত ৩টেয় ঘুম থেকে উঠে পড়াশোনা করত সত্যজ্যোতি। দিনে অন্তত ৯ ঘণ্টা পড়ত সে। কিন্তু গ্রামের অনিয়মিত বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বেশিক্ষণ পড়া হত না। সংস্থার উদ্যোগে সৌরশক্তিচালিত আলোর ব্যবস্থা হয়েছে তার বাড়িতে। শুধু সত্যজ্যোতির বাড়িতেই নয়, গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই এখন সোলার ল্যাম্পে আলো জ্বলে।

পড়াশোনার ফাঁকে সন্ধে নামার আগে একবার নিয়ম করে মাঠে লাগানো ৫০টি গাছ জরিপ করে আসত সত্যজ্যোতি। বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে জানার পর এই গাছগুলি লাগিয়েছিল সে। পড়াশোনার দৌলতে এই কিশোর বুঝেছে বাড়ির ছাওনি, আসবাব, রান্নার জ্বালানির জন্য যে গাছ কাটতে হয় তাদের, সেটি পরিবেশকে ফিরিয়ে না দিলে জীবজগৎ বিপন্ন হয়ে পড়বে। আপাতত স্কুলের কাছে একটি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে সত্যজ্যোতি। উৎসবে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাড়ি আসে। সুযোগ পেলেই পরিচর্যা করে গাছগুলির।

সত্যজ্যোতির সাফল্যে বেজায় খুশি তার স্কুল, গোটা গ্রাম। “ছেলের কীর্তিতে আমি ভীষণ গর্বিত। আমি জানি ও জীবনে কিছু করে দেখাবে।“, বলছিলেন সত্যজ্যোতির বাবা ৩৮ বছরের অনিল ডেকা।

২০১৪-১৫ সালে উদলগিরির ৬০০ পরিবারকে চা গাছের চারা দিয়েছিল ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্ডিয়া। সত্যজ্যোতির বাবা জানালেন, চা পাতা তুলে বিক্রি করে ছেলের ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের খরচ জোগাড় করবেন তিনি। আপাতত গ্রামের প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে সত্যজ্যোতি। আর বছর ১৬’র কিশোরের চোখ দিয়েই উন্নতির স্বপ্ন দেখছে উদলগিরির ছোট্ট গ্রাম।